Saturday, February 21, 2026

আশাশুনি সদরের বিভিন্ন প্রাথমিকের ক্লাস ভবনের বেহাল দশা; সাইক্লোন শেল্টার কাম ভবনের দাবী

Must read

 

আশাশুনি (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি : আশাশুনির অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুরাতন ভবনের বেহার দশায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রান নাশের ঝুকি নিয়ে আতঙ্কের মধ্য দিয়ে পাঠ্যক্রম চালিয়ে যেতে বাধ্য হতে হচ্ছে। সরজমিনে ঘুরে প্রাথমিকভাবে আশাশুনি সদর ইউনিয়নের ও ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী ৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের করুন দশার সংক্ষিপ্ত ফিরিস্তি তুলে ধরা হলো। বছরের পর বছর নতুন ভবন নির্মান না হওয়ায় অভিভাবকরা শিশু সন্তানদের ঝুকির মধ্যে স্কুলে পাঠিয়ে দুশ্চিন্তা আর উৎকন্ঠার মধ্যে থাকতে হয়। ফলে শিক্ষার্থী অনুপস্থিতর হার ও শিক্ষার্থীদের ক্লাসের প্রতি স্বাভাবিক মনোনিবেশ ভীষনভাবে বিনষ্ট হচ্ছে।
১৩৩ নং হাঁসখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়:- ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কুলে প্রথম দিকে শিক্ষার্থী সংখ্যা সন্তোষজনক ছিল। ২০০০ সালে বিদ্যালয় ভবন নির্মানের পর আগ্রহে শিক্ষার্থীরা ক্লাশে বসতে শুরু করে। বেশ স্বাভাবিকই চলছিল বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। লবনাক্ত এলাকা হওয়ায় লবন সহিষ্ণু পরিকল্পনা মাফিক ভবন নির্মান না হওয়ায় কিছু দিন যেতে যেতেই স্কুল ভবনের ছাদের বড় বড় অংশের পোলাস্তার খসে এবং ধ্বংসে পড়তে শুরু করে। দেয়াল ও পিলারে লবনাক্ত আবহাওয়ার কারনে ফাটল ধরে খসে পড়তে থাকে। ২০১৩ সালে বিদ্যালয় ভবন ব্যবহার খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন বাধ্য হয়ে ২০১৫ সালে স্থানীয় ভাবে একটি টিনসেডের ছোট ঘর নির্মান করে ক্লাশ নিতে থাকে। তাতে সংকুলা না হওয়ায় পুরাতন ভবনের একটু ভাল কক্ষও ব্যবহার করা হতো। ছাদ ধ্বসে একটি বড় চালকা শিক্ষক রমেশ চন্দ্র বৈরাগী গুরুতর আহত হন। চিকিৎসায় সুস্থ্য হতে না হতেই ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। উত্তর বলাবাড়িয়া, উত্তর গাইয়াখালী, মধ্যম বলাবাড়িয়া ও হাঁসখালী গ্রামের শিশু শিক্ষার্থীরা এ বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে থাকে। প্রধান শিক্ষক নিত্যরঞ্জন মন্ডল জানান, এ পর্যন্ত ১০/১২ বার ছাদ ধ্বসে পড়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আহত হয়েছেন। বর্ষা ও ঝড়ের সময় এ এলাকার সহস্রাধিক মানুষের আশ্রয় নেওয়ার জন্য কোন সাইক্লোন শেল্টার নেই। তাই সুষ্ঠু ভাবে স্কুল পরিচালনা, জীবন রক্ষা ও দুর্যোগের সময় আশ্রয় গ্রহনের সুযোগ করে দিতে দ্রুত সাইক্লোন শেল্টার কাম স্কুল ভবন নির্মানের দাবী এলাকার সকল মহলের।
১৭ নং গাইয়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়:- ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মান করা হয় ২০০৩ সালে। কয়েক বছর আগে থেকে ছাদ ধ্বসে পড়তে শুরু করেছে। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি ছাদ দিয়ে ভেতরে পড়ে থাকে। বাধ্য হয়ে একটি টিনসেড ঘর নির্মান করে অস্থায়ী পার্টিশান ব্যবহার করে ক্লাশ পরিচালনা করা হচ্ছে। সংকুলান না হওয়ায় পুরাতন ভবনের একটি কক্ষ বাদে বাকী কক্ষগুলো ঝুঁকির মধ্যে ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। অতিসম্প্রতি দপ্তরী ভক্ত কৃষ্ণ মন্ডলের গায়ে একবার ছাদ ধ্বসে পড়ে আহত হয়। কয়েকবার শিক্ষার্থীদের পাশেও ছাদ ধ্বসে পড়েছিল। প্রধান শিক্ষিকা উষা রানী মন্ডল জানান, গাইয়াখালী, বলাবাড়িয়া ও ঠিকুরাবাদ গ্রামের শিশু শিক্ষার্থীরা স্কুলে পড়ালেখা করে থাকে। বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতায় স্কুলের মেঝে পানিতে তলিয়ে যায়। বছরে ৫/৬ মাস শিক্ষার্থীরা স্কুল চত্বরে খেলাধুলা করা থেকে বঞ্চিত থাকে। মাটি ভরাট ও নতুন ভবন কাম সাইক্লোন শেল্টার নির্মান এখন খুবই জরুরী হয়ে হয়ে পড়েছে। এছাড়া দুটি ল্যাট্রিনের একটি নষ্ট, টিউবওয়েল নষ্ট, খাবার পানির সংকট, জানালা নষ্ট, বেঞ্চ ও চেয়ার সংকট এবং আসবাবপত্রের অভাব প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে।
১০৫ নং নাটানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়:- ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত অফিসসহ ৪টি কক্ষ বিশিষ্ট ভবন নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ভবনের ছাদ ধ্বসে পড়া, পিলার ও দেয়ালে ফাটল রয়েছে। যার দুটি কক্ষেরই অবস্থা অত্যান্ত সোচনীয়। মাঝে মধ্যে ছাদের ছোটখাট অংশ ধ্বসে পড়লেও একবার ছুটির সময় বড় অংশ পড়েছিল। ভাগ্য সহায় থাতায় প্রাণহানি ঘটেনি। বাধ্য হয়ে একটি অস্থায়ী টিনসেড ঘর নির্মান করা হয়েছে। প্রধান শিক্ষক দীপঙ্কর মল্লিক জানান, নতুন ভবনের জন্য বারং বার শিক্ষা অফিসে জানানো হয়েছে। স্কুলে যাতয়াতের পথটিও অত্যান্ত বেহাল দশা। সীমানা প্রচীর না থাকায় সমস্যার অন্ত নেই। অবিলম্বে নতুন ভবন, প্রাচীর নির্মান ও রাস্তা সংস্কার অতিব প্রয়োজন।
৯২ নং কমলাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়:- ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কুলটির নতুন ভবন নির্মান করা হয় ১৯৯৪ সালে। দীর্ঘদিনের পুরনো ভবনের ছাদ ধ্বসে পড়ছে, দেয়াল, পিলার ও কার্ণিশে ফাঁটল ধরেছে। ছাদের বড় অংশ ভেঙ্গে পড়েছিল। অল্পের জন্য প্রাণহানি ঘটেনি। টয়লেটের ছাদ ভেঙ্গে পড়ে ব্যবহার খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কমলাপুর, খাসেরাবাদ, দাশেরাটি ও বিল নাটানা গ্রামের ছেলেমেয়েরা স্কুলে আসে। কয়েকবার ভবনটি মেরামত করা হয়েছে। এখন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে। প্রধান শিক্ষক আফরোজা হোসেন জানান, ভবনের ভঙ্গুর দশার পাশাপাশি, টিউবওয়েল নষ্ট, টয়লেট সমস্যা, যাতয়াতের পথের দুরাবস্থা, প্রাচীরে ভাঙ্গন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার পরিবেশে বাধা হয়ে দাড়িয়েছে। দ্রুত নতুন ভবন, প্রাচীর, টয়লেট নির্মান করা জরুরী।
১৪০ নং পুইজালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়:- ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কুলটির নতুন ভবন নির্মান করা হয় ২০০০ সালে। ছাদ ধ্বসে পড়ছে, ওয়াল, দরজা-জানাল ভেঙ্গে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে অফিস কক্ষ বন্ধ করে দিতে হয়েছে। ২০২১ সালে অস্থায়ী ২ কক্ষ বিশিষ্ট টিনসেড ঘর নির্মান করা হয়। ক্লাশ পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ, বর্ষার সময় পানি পড়ে, স্কুল চত্বর পানিতে নিমজ্জিত হয়ে থাকে। কয়েকবার ছাদ ধ্বসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পাশে পড়েছিল এবং এক ছাত্রের মাথা ফেটে যায়। টিউবওয়েল নেই, বৃষ্টির পানি সংরক্ষনের ট্যাংকি নষ্ট হয়ে গেছে, অভিভাবকরা বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে আগ্রহ হারাচ্ছে। প্রধান শিক্ষক চন্দ্রাবতী সরকার জানান, এলাকায় ২৫০০ মানুষের বসবাস, প্রত্যান্ত বিল, খালের মধ্যে অবস্থিত এসব এলাকার মানুষকে দুর্যোগের সময় আশ্রয় নেয়ার কোন উচু জায়গা নাই। যাতয়াত ব্যবস্থাও খুবই নাজুক। রাস্তা পানিতে তলিয়ে থাকে। এখানে একটি সাইক্লোন শেল্টার কাম স্কুল ভবন নির্মান সময়ের দাবী। তাছাড়া টিউবওয়েল, টয়লেট, রাস্তা নির্মান খুবই প্রয়োজন।
১৪৭ নং লক্ষ্মীখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়:- ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কুলের নতুন ভবন নির্মীত হয় ২০০২ সালে। ভবনের অবস্থা ব্যবহার অনুপযোগি হয়ে পড়লে গ্রামের মানুষের সহযোগিতায় ২০২১ সালে ছাদ ভেঙ্গে টিনের ছাউনি দেওয়া হয়। ৩ বার ছাউনী ঝড়ে উড়ে গেলে আবারও কোন রকমে ছেয়ে ক্লাশ করা হচ্ছে। দেয়াল খসে পড়ছে, চাল দিয়ে বর্ষার পানি ভিতরে পড়ে। স্কুল চত্বর পানিতে তলিয়ে যায়। পুইজালা বাজার থেকে আড়াই কিলোমমিটার রাস্তার প্রায় সবই কাচা ও চলাচল অনুপযোগি। বর্ষার সময় রাস্তা, স্কুল চত্বর পানিতে তলিয়ে থাকে। যানবাহন চলাচল করতে পারেনা, ছাত্র/ছাত্রীরা নৌকায় ও হাটু পানি ঠেলে স্কুলে যাতয়াত করে। টয়লেট হাউজ পানিতে তলিয়ে থাকায় একটি ব্যবহার করা অনুপযোগ হয়ে গেছে। টিউবওয়েল না থাকায় পাশের বাড়ি থেকে পানি চেয়ে নিয়ে খেতে হয়। দ্রুত ভবন নির্মান, টিউবওয়েল, পায়খানা ঘর নির্মান, মাঠ ভরাট, রাস্তা সংস্কার করা জরুরী।
উপজেলা শিক্ষা অফিসের সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও ক্লাস্টার অফিসার শাহজাহান আলী জানান, এসব বিদ্যালয় গুলির অবস্থা বেশ আগে থেকে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আমাদের পরামর্শে পাশে অস্থায়ী টিনসেড নির্মান করে ক্লাশ চালান হচ্ছে। দৃষ্টিনন্দন না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা স্কুলে যেতে স্বাচ্ছন্দবোধ করে না। কোন কোনটির ছাদ ভেঙ্গে পড়েছে। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে চাচ্ছেনা। আমরা ভবন নির্মানের জন্য উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ বরাবর ছবিসহ তালিকা প্রেরন করেছি। কিন্তু এখনও কোন প্রকার সাড়া পাওয়া যায়নি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে। উল্লেখিত স্কুলগুলির স্বাভাবিকভাবে পাঠদান পরিচালনা করার নিমিত্তে দ্রুত নতুন ভবন কাম সাইক্লোন শেল্টার নির্মানের জন্য উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন ভূক্তভোগী শিক্ষক, অভিভাবক ও সচেতন এলাকাবাসি।

More articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest article