লেখক শেখ জহরুল আলম : শেখ আবুল কাসেম মিঠুন ছিলেন সাংবাদিক, ঔপন্যাসিক, চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট লেখক, সংগীত রচয়িতা, সুরকার এবং চলচ্চিত্র শিল্পে একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা। তিনি ছিলেন সুস্থ সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ। তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা ও বিকাশে প্রতিষ্ঠিত প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ সংস্কৃতি কেন্দ্র’-এর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ছিলেন তিনি। বাংলাদেশে সুস্থধারার চলচ্চিত্র নির্মাণে তিনি আজীবন কাজ করেছেন। সংগঠক হিসেবেও তার কৃতিত্ব কম নয়। তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির প্রচার ও দপ্তর সম্পাদক এবং চলচ্চিত্র লেখক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে। ইসলামি মূল্যবোধে উজ্জীবিত আবুল কাসেম মিঠুন হঠাৎ করে ২০০১ সালে চাকচিক্যময় চলচ্চিত্র জগত থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি ইসলামি জ্ঞানের আলোকে জীবন গঠনের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে সভা-সমিতি, সিম্পোজিয়াম ইত্যাদিতে উদ্দীপনামূলক বক্তৃতা প্রদান করেছেন। তার অকাল মৃত্যুতে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।
শেখ আবুল কাসেম মিঠুনের জন্ম ১৮ ই এপ্রিল ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন খুলনা জেলার আশাশুনি থানার ঐতিহ্যমন্ডিত দরগাহপুর গ্রামে। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া মিঠুনের পিতার নাম শেখ আবুল হোসেন, মায়ের নাম মোছাম্মাৎ হাফিজা খাতুন। এসএসসি পরীক্ষার সার্টিফিকেটে তার নাম লেখা হয়েছে শেখ আবুল কাসেম। তার পিতৃপ্রদত্ত ডাকনাম ‘মিঠু’। চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করে (১৯৭৮) হয়তো তার সাদামাটা নামের বৈচিত্র আনায়নের জন্য আবুল কাসেম মিঠুন নামেই পরিচিত হন। বংশগত পদবি ‘শেখ’ উহ্য থাকে। পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন ও গ্রামবাসীর নিকট তিনি তার ডাকনাম মিঠু নামেই পরিচিত। মিঠুন নামটি শুধু চলচ্চিত্র জগতেই শোনা যায়। পিতা শেখ আবুল হোসেনে কাছে ৪-২-১৯৮৫ তারিখে লেখা এক পত্রে তিনি এভাবে ইতি টেনেছেনÑ‘ইতি আপনার স্নেহের মিঠু’। অর্থাৎ মিঠুন নামটি তিনি অলঙ্কারিক অর্থে ব্যবহার করেছেন তা স্পষ্ট।
শেখ আবুল কাসেম যে পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন তার রয়েছে দীর্ঘ একটি ঐতিহ্যমন্ডিত ইতিহাস। তার বংশ লতিকায় উর্দ্ধতন পুরুষের সঙ্গে জন্মস্থান দরগাহপুর গ্রামের নামটিও জড়িত। ব্রিটিশ আমলে এই গ্রামটিকে ডাকা হতো ‘দুর্গাপুর’ নামে। আবুল কাসেম-এর এক উর্ধ্বতন পুরুষ (দাদা সম্পর্কীয়) মওলানা বজলর রহমানের মনে প্রত্যয় জন্মে, যে গ্রামে এক ঘরও হিন্দু বসতি নেই সে গ্রামের নাম কখনো হিন্দু দেবীর নাম অনুসারে হতে পারে না। নিশ্চয়ই এর পশ্চাতে রয়েছে হিন্দু জমিদারের ধর্মীয় মানসিকতার সংকীর্ণ কারসাজি। গ্রামের দন্ড মুন্ডের কর্তা হিন্দু জমিদার নিশ্চয়ই নামটি বিকৃত করে তাদের দেবীর নামে রেখেছেন। নামকরণের এই কারচুপির বিষয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া যায় এক গবেষকের লেখনীতেÑ
খুলনা জেলার বাঁকা, রাড়ুলি, কাটিপাড়া এবং সাতক্ষীরা জেলার খেসরার ধনাঢ্য ও কুলীন হিন্দু সম্প্রদায় চিরস্থায়ী ভিত্তিতে দক্ষিণ খুলনা তথা সুন্দরবন অঞ্চলের জমিদারী লাভ করেন। লাখারাজপ্রাপ্ত ভূ-সম্পত্তি ছাড়া গ্রামের অন্যান্য ভূ-সম্পত্তি বাঁকার জমিদারদের অধীনে চলে গেল। দরগাহপুর গ্রামবাসীরা হলেন বাঁকার হিন্দু জমিদারের প্রজা। জমিদার বাবুর খতিয়ানে মৌজার নাম দুর্গাপুর রেকর্ড করে দরগাহপুর গ্রাামের নাম দুর্গাপুর পরিবর্তিত করেন। (দরগাহপুর গ্রামের নামকরণ : শেখ আবদুল জলিল, মাসিক পল্লীকথা ১ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা এপ্রিল ২০০৯।)
কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী মওলানা বজলর রহমান জানতেন তার গ্রামটি ইংরেজ আগমনের পূর্বে (১৭৫৭) নদীয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। তহসিল অফিস ছিল গৌড়কৃষ্ণনগর। অনুসন্ধান বিশারদ মওলানা বজলর রহমান কৃষ্ণনগর তহসিল অফিসে অনুসন্ধান করলেন। দলিল-দস্তাবেজ ঘেঁটে তিনি নিশ্চিত হলেন গ্রামের নাম দুর্গাপুর নয়, দরগাহপুর। প্রমাণ হিসেবে তিনি পেলেন সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে তার নিযুক্ত বাংলার সুবেদার সালাহউদ্দিন মাহমুদ খাঁ মুসলিম প্রধান গ্রাম দরগাহপুরে এসেছিলেন। ইসলামি ঐতিহ্যমন্ডিত গ্রামের পরিবেশ মাহমুদ খাঁকে আকৃষ্ট করে। গ্রামের পাঁচটি প্রধান পরিবারকে লাখারাজ ভূসম্পত্তি দান করেন। এরাই হলেন গ্রামের আদি বাসিন্দা। মওলানা বজলর রহমানের উর্ধ্বতন পুরুষ শেখ জামাল ৫টি পরিবারের একজন (লাখারাজ সনদ নং-১৯৫২১)। শেখ জামালের সহোদর ভ্রাতা শেখ লাল মাহমুদ (মিঠুর পূর্বপুরুষ) এর লাখারাজ সনদ নং ১৯৫২২। ফারসি ভাষায় লিখিত দানপত্রে গ্রামের নাম দরগাহপুর লেখা হয়েছে।
কৃষ্ণনগর তহসিল অফিস থেকে সংগৃহীত কাগজপত্র ও দলিল দস্তাবেজ নিয়ে এসে মওলানা বজলর রহমান নাম বিকৃতকরণের প্রতিবাদে শুরু করলেন জমিদারের বিরুদ্ধে আন্দোলন। প্রতিবাদের অংশ হিসেবে তিনি তার নামের শেষ ‘দরগাহপুরী’ নাম লেখাও যুক্ত করেন। আবিষ্কার করেন দলিল-দস্তাবেজে গ্রামের পত্তনকারীর নামও। অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করেন, দর্গাই শাহ নামে তাঁরই উর্ধ্বতন এক পুরুষ এই গ্রামের পত্তনকারী। জবরদস্ত এই ওলি সুদূর বাগদাদ থেকে ইসলাম প্রচারের জন্য এই এলাকায় এসেছিলেন। তিনি নদীঘেরা জঙ্গলপূর্ণ আবাদহীন সুন্দরবনের অন্তর্গত গ্রামটিতে বসবাসের জন্য বেছে নেন। দর্গাই শাহ বা শাহ মোহাম্মদ বাগদাদীর নাম অনুসারে পত্তনকৃত গ্রামের নাম দরগাহপুর হয়েছে। মওলানা বজলর রহমান দরগাহপুরী তার বিখ্যাত কিতাবের ভূমিকায় এই সম্পর্কে লিখেছেন Ñ
বাগদাদের বিখ্যাত হালাকু খাঁর হাঙ্গামার পর বিগত বাংলা ১০৫৪ সালে (হিজরী ১০৬৬ সাল ইং সন ১৬৪৭ খ্রিস্টাব্দ) শেখ মোহাম্মদ শাহ বাগদাদী নামক জনৈক আওলিয়া নিজ স্ত্রীসহ প্রসিদ্ধ বাগদাদ নগরী হইতে সুদূর বঙ্গপল্লীতে ইসলাম প্রচারার্থে দরগাহপুর নামক গ্রামে নিজ বাসস্থান নির্ধারণ করেন। গ্রামটি কপোতাক্ষ নদীর দ্বারা প্রায় পরিবেষ্ঠিত Ñএকটি দ্বীপ বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। কথিত আছে, তিনি যখন উক্ত গ্রামে বাসস্থান মনোনীত করেন তখন উক্ত গ্রামটি এক প্রকার জঙ্গল ও জলা ভূমিতে পরিণত ছিল। তিনি সেই জঙ্গলে যেস্থানে লতাপাতা বিশিষ্ট ক্ষুদ্র কুঁড়েঘর নির্মাণ করিয়াছিলেন বর্তমানে সেই স্থানটি ‘গোরবাড়ি বাগান’ বলিয়া বিখ্যাত। (আত্ম-কথা : মওলানা বজলর রহমান দরগাহপুরী, তারিকুল হাদিস গ্রন্থের ভূমিকা মাঘ-১৯৫৬)।
শেখ আবুল কাসেম মিঠু গ্রামের পত্তনকারী শাহ মোহাম্মদ বাগদাদীর- এর বংশের অধস্তন পুরুষ। মওলানা বজলর রহমান দরগাহপুরী ও শেখ আবুল কাসেম মিঠুন একই বংশের সন্তান। উল্লেখ্য, শেখ আবুল কাসেম মিঠু তার পূর্বপুরুষদের প্রথম আবাসস্থল যা বর্তমানে গোরস্তান হিসেবে ব্যবহৃত সেই ‘গোরবাড়ি বাগানেই’ সমাহিত হয়েছেন।
শেখ আবুল কাসেম-এর বংশ লতিকা
শেখ মোহাম্মদ শাহ বাগদাদী (দর্গাই শাহ)
লাল মাহমুদ শেখ জামাল
ছনুক মাহমুদ(শেখ সাঈদ)
শেখ মাহমুদ জামাল শেখ মোহাম্মদ রাজী
শেখ আজিম (৭টি কন্যা) শেখ নাজেম
(৭ পুত্র ১ কন্যা)
শেখ নাতেকুল্লাহ (কনিষ্ঠ পুত্র)
৪ পুত্র
শেখ আবদুল মতিন (জ্যেষ্ঠপুত্র)
আবদুল ওয়ারেস আবুল হোসেন শেখ আবদুল বারী আবদুল করিম
৩ পুত্র ৬ কন্যা
পুত্র : শেখ আবুল কাসেম মিঠু. জাকির হোসেন ও ফারুক হোসেন।
কন্যা : ফজিলাতুন্নেছা ফুজি, রাবেয়া খাতুন রাবি, সালেহা বেগম, সাবিহা সুলতানা, সাহানা সুলতানা ময়না, ইসমাত আরা পুতুল।
শেখ আবুল কাসেম মিঠুর পিতা শেখ আবুল হোসেন জন্মগ্রহণ করেন ১৩২৮ বাংলা সালের ২৫ শে বৈশাখ শুক্রবার(১৯২১ খ্রি)। দরগাহপুর লোয়ার প্রাইমারি (এল পি) স্কুল থেকে পাঠ গ্রহণ শেষে তার আত্মীয় শেখ রজব আলী (শেখ আরশাদ আলীর পিতা) তাকে কাদাকাটি গ্রামের মক্তবে ভর্তি করে দেন। তিন বছর লজিংয়ে থেকে এই মক্তবে পড়ে মিডিল ইংলিশ (এম ই) পরীক্ষায় পাস করেন। ১৯৩৮ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত পড়েছেন তালা থানার ইসলামকাঠি হাই স্কুলে। সেখানে চাঁদ সওদাগর নামে এক গৃহস্থের বাড়িতে লজিং থেকে পড়াশুনা করতেন। আর্থিক অচ্ছলতার কারণে ১৯৪২ সালে অনুষ্ঠিতব্য মেট্রিক পরীক্ষার ফরম ফিলাপ করতে পারেননি। মনের কষ্টে ১৯৪২ সালে যশোহর জেলার ভা-ারখোলা প্রাইমারি স্কুলে মাসিক ৩ টাকা বেতনে শিক্ষকতার চাকুরি গ্রহণ করেন। এর পর খেওনা প্রাইমারি স্কুল ও পরে মাছিয়াড়া প্রাইমারি স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৪৪ সালে খুলনা গুরু ট্রেনিং স্কুল (পিটিআই) থেকে গুরু ট্রেনিং প্রশিক্ষণ নেন এবং পাস করেন।
পিতার সম্মতিতে ৭-৫-১৯৪৫ তারিখে বেলা সাড়ে আটটায় পাইকগাছা থানার হিতামপুর গ্রামে মীর হায়দার আলী ও মোছাম্মৎ ছায়েরা খাতুনের একমাত্র কন্যা মোছাম্মৎ হাফিজা খাতুনের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন শেখ আবুল হোসেন। বিয়ের দেনমোহর ছিল পাঁচশত টাকা। বিয়ের পরে প্রধান শিক্ষক পদে শেখ আবুল হোসেন চাকরি গ্রহণ করেন কৃষ্ণনগর প্রাইমারি স্কুলে। দরগাহপুর থেকে স্কুলটির অবস্থান কাছাকাছি। ১৯৪৮ সালের ১লা মে শনিবার তার প্রথম কন্যাসন্তান মোছাম্মৎ ফজিলাতুন্নেছার জন্ম হয়। ২য় সন্তান শেখ আবুল কাসেম মিঠুর জন্ম ১৯৫১ সালের ১৮ই এপ্রিল বুধবার।
তখনকার দিনে প্রাইমারি স্কুল বেসরকারিভাবে পরিচালিত হতো। নিয়মিত বেতন পাওয়া যেতো না। শেখ আবুল হোসেন শিক্ষকতার পেশা ত্যাগ করে পুস্তক ব্যবসায়ের পেশা গ্রহণ করেন। গ্রামের আর একজন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক শেখ হাফিজউল্লাহও যোগ দেন তার ব্যবসায়ে। নৌকায় করে দক্ষিণ খুলনার গ্রামে গঞ্জের হাট-বাজারে তারা যৌথ কারবারি হিসেবে বইয়ের ব্যবসা করতেন। অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে শেখ হাফিজউল্লাহ খুলনা শহরে ‘কিতাব মহল’ নাম দিয়ে বইয়ের দোকান করেন। শেখ আবুল হোসেন গ্রামেই ‘দরদী লাইব্রেরি’ নাম দিয়ে পুস্তক ব্যবসা অব্যাহত রাখেন। শেখ আবুল হোসেন (মিঠুর পিতা) ইন্তেকাল করেন ২৮-১০-১৯৯৮ তারিখে।
আবুল কাসেম মিঠুনের মা মোছাম্মৎ হাফিজা খাতুন ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয় উত্তীর্ণ শিল্পমনা নারী উদ্যোক্তা। বড় একটি সংসারের কর্ত্তী হয়েও হাতের কাজ যেমন সেলাই ও এমব্রয়ডারি কাজে দক্ষ ছিলেন এবং করতেন। তার বাড়ির আঙিনায় ছিল নানাবিধ মৌসুমী ফুলের গাছে সমৃদ্ধ। দুগ্ধজাত পণ্য বিশেষ করে ঘোল, ঘি এবং মিষ্টি প্রস্তুত করতেন ঘরোয়াভাবে। হাফিজা খাতুনের পিতা মীর হায়দার আলীর মা ছিলেন দরগাহপুর গ্রামের কন্যা। হায়দার আলী শৈশব কেটেছে নানাবাড়ি দরগাহপুরে। এই গ্রামকে তিনি এতোই পছন্দ করতেন যে, তিনি ওছিয়ত করে যান তাকে যেন দরগাহপুর গ্রামে সমাহিত করা হয়। মীর হায়দার আলী ৩১-৩-১৯৭৫ তারিখে ইন্তেকাল করেন এবং তার শেষ ইচ্ছানুসারে দরগাহপুর গ্রামে নানাদের পারিবারিক গোরস্তানে সমাহিত করা হয়েছে।
মিঠুনের মা মোছাম্মৎ হাফিজা খাতুন দীর্ঘদিন চলশক্তিহীন অবস্থায় খুলনায় তার দ্বিতীয় পুত্র শেখ জাকির হোসেনের নিরালার বাসায় কাটিয়েছেন। জ্যেষ্ঠপুত্র আবুল কাসেম মিঠুকে দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করলে ঢাকা থেকে মিঠু খুলনায় যান এবং সেখানেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। মোছাম্মৎ হাফিজা খাতুন ইন্তেকাল করেন ২০২৩ সালে। তাকে দরগাহপুরে পারিবারিক গোরস্তানে সমাহিত করা হয়েছে।
শেখ আবুল কাসেম মিঠুর পিতামহ শেখ আবদুল মতিন ছিলেন দরগাহপুর গ্রামের প্রাচীন মসজিদের অবৈতনিক মোয়াজ্জিন। তার উচ্চকণ্ঠের সুমধুর আজানের ধ্বনির স্মৃতি আজো কিংবদন্তি হয়ে রয়েছে। তখনকার দিনে মাইক ছিল না। তিন চার মাইল দূর থেকেও তার আজানের ধ্বনি শ্রুতিগোচর হতো। প্রতি বছরই নিয়ম করে ফুরফুরার দাদা হুজুর হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রহ) দরগাহপুর গ্রামে তসরিফ আনতেন। সপ্তাহব্যাপী মুরিদদের মধ্যে কাটাতেন। তিনি মোয়াজ্জিন শেখ আবদুল মতিনকে খুবই পছন্দ করতেন। ভারত বিভক্তির পূর্ব পর্যন্ত প্রতি বছর শেখ আবদুল মতিন যোগ দিতেন হুগলির ফুরফুরা শরিফের ইছালে ছাওয়াব মাহফিলে। সেখানকার মসজিদেও মাহফিলের তিন দিন তিনি আজান দিতেন। তার স্ত্রী অর্থাৎ মিঠুর দাদী (দাদা ও দাদী চাচাতো ভাই-বোনও বটে) মোছাম্মৎ নজিরোনন্নেছা ছিলেন মওলানা বজলর রহমান দরগাহপুরীর জ্যেষ্ঠ বোন।
কে এই মওলানা বজলর রহমান দরগাহপুরী? মওলানা দরগাহপুরী কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ১৯২১ সালে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেন। চাকরি গ্রহণ করেন স্যার পি সি রায় প্রতিষ্ঠিত রাড়ুলি হাই স্কুলে। এখানে প্রায় দুই বছর চাকরি করার পর হিন্দু জমিদারদের সাথে অনাকাঙ্খিত ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে বসিরহাট জুনিয়র মাদ্রাসায় (বর্তমানে বসিরহাট টাউন হাই স্কুল) যোগ দিয়েছিলেন হেড মৌলভীর পদে। বাংলা প্রদেশের শিক্ষা বিভাগের সহকারী ডিরেক্টর খান বাহাদুর আহছানউল্লার মাধ্যমে পরিচিত হন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের সঙ্গে। শেরে বাংলার পরামর্শে শিক্ষকতার পাশাপাশি ওয়াজ মাহফিল করে অনগ্রসর মুসলিম সমাজকে ধর্মীয় গোঁড়ামি হতে মুক্ত হয়ে শিক্ষার পথে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানাতে থাকেন। সুললিত কষ্ঠস্বর ও কুরআন হাদিসের ওপর অগাধ দখল থাকায় অচিরেই মওলানা দরগাহপুরী একজন বাগ্মী ও ওয়াজিয়ান হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছিলেন। মুসলমানেদের স্বার্থেই যোগ দিয়েছিলেন তিনি রাজনীতিতে।
মওলানা দরগাহপুরী একজন সুলেখক ও সাংবাদিকও। ২০ বছরের অক্লান্ত সাধনায় তার প্রণীত ‘তারিখুল হাদিস ও বঙ্গানুবাদ বোখারী শরিফ’ ১৩৫৬ বাংলা সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। সাতচল্লিশের দেশবিভাগে তিনি ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণে বাধ্য হন সেখানকার সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য। মওলানা হোসেইন আহমেদ মাদানী (রহ) প্রতিষ্ঠিত জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দের চব্বিশ পরগণা জেলার সভাপতি ছিলেন মওলানা দরগাহপুরী। ১৯৬২ সালের পশ্চিম বাংলার বিধান সভার নির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে (জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ নির্বাচনে অংশ নেয়নি) প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন। নির্বাচনী এলাকা দেগঙ্গা কেন্দ্র। ২১,০৬৮ ভোট পেয়ে তিনি বিধান সভার সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বরদামুকুট মণি পান ১১,৪৪৯ ভোট। সাংবাদিক হিসেবেও মওলানা দরগাহপুরী মশহুর। ‘মোসলেম’ ‘জমিয়ত’ প্রভৃতি পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তিনি। এই দাদা তার প্রিয় নাতি শেখ আবুল কাসেম মিঠুকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন।
মিঠুর পিতৃব্য শেখ আবদুল বারী ১৯৪৭ সালে মেট্রিক পাশ করেন। স্নাতক পাসের পর তিনি জেলা আনসার এ্যাডজুটেন্ড হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এলএলবি ডিগ্রি অর্জনের পরে সরকারি চাকরি ছেড়ে যোগ দেন খুলনা জজ কোর্টে আইন পেশায়। প্রথিতযশা আইনজীবী হিসেবে খুলনায় তার সুনাম ছিল।
মিঠুর ছোট চাচা শেখ আবদুল করিম ছিলেন পবিত্র কোরআনের হাফেজ। ১৯৫২ সালে তিনি হেফজুল কুরআন সম্পন্ন করেন। মওলানা রুহুল আমীন প্রতিষ্ঠিত বসিরহাট আমেনিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন। কর্মপাগল এই হাফেজ চব্বিশ পরগণা জেলার মুকুন্দপুর, ইসলামপুর, রাজবল্লভপুর, হোরপুর প্রভৃতি গ্রামে উদ্যোগী গ্রামবাসীর সাহায্যে হেফজুল কোরআন মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এই সময়ে তিনি তার মামা মওলানা বজলর রহমান দরগাহপুরীর বসিরহাটের খোলাপোতার বাড়িতে থাকতেন। ১৯৭৩ সালে তিনি নিজ গ্রাম দরগাহপুরে প্রতিষ্ঠা করেন ‘দরগাহপুর বাগদাদিয়া রহমানিয়া দারুল কোরআন মাদ্রাসা’। মাদ্রাসাটি বর্তমানে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। তার ২ পুত্র ও কন্যা সবাই কোরআনের হাফেজ। তিনি ৮-১২-২০০৬ তারিখে ইন্তেকাল করেন। বর্তমানে এই মাদ্রাসায় ৪০ জনের উপর ছাত্র হাফিজি তালিম নিচ্ছে। এ পর্যন্ত এই মাাদ্রাসা থেকে পাঁচ শতাধিক ছাত্র হিফজুল কোরআন সম্পন্ন করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
এমনই একটি কঠোর ধর্মীয় অনুশাসন পালনকারী তৌহিদ পোরস্ত পরিবারের সদস্য ছিলেন শেখ আবুল কাসেম মিঠুন। তার ছোট ভাই শেখ জাকির হোসেনও পবিত্র কোরআনের হাফিজ। মিঠুর ভাই বোনের সংখ্যা খুব বেশি। ৩ ভাই ৬ বোন। পর্যায়ক্রমে তাদের নাম মোছাম্মৎ ফজিলাতুন্নেছা, আবুল কাসেম মিঠুন, রাবেয়া খাতুন রাবি, সালেহা বেগম, সাবিহা সুলতানা, সাহানা খাতুন ময়না, ইসমাতআরা পুতুল, জাকির হোসেন ও ফারুক হোসেন। বর্তমানে সকলেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।
বেশ বিস্তৃত একটি প্রাঙ্গণ নিয়ে শেখ আবুল কাসেম মিঠুনের পৈতৃক নিবাস। বাড়িতে ছিল শিল্প সাহিত্য চর্চার অনুকূল পরিবেশ। পিতা খুব স্বচ্ছল ছিলেন না। কিন্তু সন্তানদের লেখাপড়া শেখানোর প্রতি তার কোনো কার্পণ্য ছিল না। আবুল কাসেম মিঠুর সাংস্কৃতিক ও লেখক জীবনে দরগাহপুর গ্রামের ইসলামি পরিবেশ ও মূল্যবোধ যথেষ্ট প্রভাব রেখেছে। জীবনের মাঝপথে এসে হঠাৎ তার চাকচিক্যময় জীবন থেকে ইসলামি মূল্যবোধের জীবনে ফিরে আসা ঘটনাচক্রে ঘটেনি। সমৃদ্ধ পারিবারিক ভিত্তির উপরই নির্ভর করে তার জীবনের মোড় পরিবর্তন। এক কথায় শেখ আবুল কাসেম মিঠুন জীবনব্যাপী সমৃদ্ধ ইসলামি মূল্যবোধে সুসংগঠিত গৌরবময় বংশধারার প্রতিনিধিত্ব করেছেন মাত্র। অধ্যায় শেষ ।
